দোহারে অফিস সহকারী নজরুলের দুর্নীতি ও সম্পদের পাহাড় ঘিরে প্রশ্ন

 "দোহার উপজেলা অফিস সহকারী নজরুলের নামে বেনামে সম্পদের পাহাড়: রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার"

দোহার থানা প্রতিনিধি: ঈমানুল কায়েস 
প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৪


অফিস সহকারী নজরুল

ঢাকার দোহার উপজেলার অফিস সহকারী নজরুল কবির রিপন প্রায় এক দশক ধরে দোহারে কর্মরত আছেন। দীর্ঘদিন এই অঞ্চলে কাজ করার সুবাদে তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও নানা শ্রেণির মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সম্প্রতি বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মৈনটঘাটে প্রতিদিনের খাস কালেকশনের টাকার হিসাবের গড়মিল, নাম-বেনামে সম্পদ অর্জন ও প্রতারণা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মৈনটঘাটে কোনো ইজারা না থাকায় খাস কালেকশনের টাকা সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন নজরুল কবির। অভিযোগ অনুসারে, তিনি সরকারি এই অর্থের সঠিক হিসাব রাখছেন না এবং তা থেকে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন।


ঘাটের স্পিডবোট ও লঞ্চের দেখাশোনা করেন আক্তার হোসেন নামে এক ব্যক্তি। আক্তার হোসেন জানান, প্রতিদিনের খাস কালেকশনের টাকার হিসাব নজরুল কবিরের কাছে স্থানীয় আজিজ মাষ্টারের মাধ্যমে পাঠানো হয়। এ প্রসঙ্গে আক্তার আরও বলেন যে, গত মাসের জমাকৃত টাকার খাতা আজিজ মাষ্টারের কাছে রাখা আছে। তবে আজিজ মাষ্টারকে টেলিফোনে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কোনো হিসাব দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ঘাট থেকে প্রতিদিন যে অর্থ আদায় হচ্ছে তার বড় অংশই নজরুল ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছে যাচ্ছে এবং এ কারণে সরকার প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।


নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে সরকারি জমি দখল এবং তার নামে ভুয়া নথিপত্র তৈরি করা। তিন বছর আগে নজরুল নিজের আত্মীয় পরিচয়ে ঢাকা জেলার বাইরের দুই ব্যক্তির নামে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করেন এবং এই নথির ভিত্তিতে সরকারি জমি বন্দোবস্ত নেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জমি দখল নিশ্চিত করতে তিনি রাতের অন্ধকারে গাইডওয়াল নির্মাণের চেষ্টা চালান। তবে এলাকাবাসীর বাধার মুখে তিনি এই কাজে সফল হননি।


এই জমি দখল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর নজরুল আরেকটি কৌশল অবলম্বন করেন। দোহারের ঠিকানায় ভোটার হিসেবে নিজেকে নিবন্ধিত করার জন্য মাহমুদপুর ইউনিয়নের মো. জয়নাল নামে এক ব্যক্তির জমি লিখে নেন। দীর্ঘদিন পার হলেও নজরুল সেই জমি ফেরত দেননি এবং এখনো সেটি নিজ দখলে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নজরুলের সীমিত বেতনের চাকরি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ময়মনসিংহে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া গত ৬ আগস্ট দোহারের এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি নিশান ব্র্যান্ডের গাড়ি কেনেন। এই গাড়িটি উপজেলায় পার্কিং করা হলেও প্রশাসন এ বিষয়ে কিছুই জানে না বলে দাবি করেছে।


নজরুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি নিয়ে প্রশাসনের কাছে জানতে চাওয়া হলে কোনো স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে তথ্য সংগ্রহের জন্য চার ঘণ্টা অপেক্ষার পরেও নজরুল তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে অস্বীকার করেন এবং এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানান। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা তাঁর বক্তব্যের জন্য অপেক্ষা করলেও নজরুল সরাসরি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।


মৈনটঘাটের খাস কালেকশন এবং নজরুলের কর্মকাণ্ড নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরা বাইরে রেখে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন জানান, মৈনটঘাটের খাস কালেকশনের জন্য নতুন একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা স্থানীয় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। তিনি আরও বলেন যে, কোনো ব্যক্তির অবৈধ আয় বা সম্পদের জন্য প্রশাসন দায় নেবে না এবং এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।


নজরুলের বিরুদ্ধে ওঠা এইসব অভিযোগ দোহারের সাধারণ মানুষের মাঝেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নজরুলের এই কর্মকাণ্ড তাঁর পদবি ও দায়িত্বের প্রতি এক ধরনের অবমাননা। এভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর সাধারণ জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। স্থানীয়দের দাবি, নজরুলের মতো কর্মকর্তাদের ব্যাপারে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নেবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাকে যথাযথ জবাবদিহিতার আওতায় আনবে।


এ অবস্থায় নজরুলের মতো কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ওপর সরকার নজরদারি বাড়ানো জরুরি হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের নিশ্চয়তা তৈরি করা সম্ভব হবে।